ঢাকা থেকে যেসব ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রের ভিসা ইস্যু করা হয় না, সেসব দেশের জন্য ঢাকায় একটি ভিসা সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সোমবার সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এই অনুরোধ জানান।
বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, অভিবাসন, মানবপাচার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে অন্যতম প্রধান শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও চিকিৎসা সহ বিভিন্ন কারণে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিতভাবে ইইউ দেশগুলোতে যাতায়াত করে। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে অন্যতম। নয়াদিল্লিতে গিয়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোর ভিসা সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ, কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। তাই, ইইউভুক্ত দেশগুলোর জন্য ঢাকায় একটি ভিসা সেন্টার খোলা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রদূত জানান, তিনি বিষয়টি ইইউভুক্ত দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ইইউ রাষ্ট্রদূতকে উপদেষ্টা আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও দীর্ঘদিনের বন্ধু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইইউ বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে ইইউর সমর্থন জানান এবং বলেন, বাংলাদেশ চাইলে ইইউ প্রয়োজনীয় দক্ষতা, সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় উপদেষ্টা সংশ্লিষ্টদের জন্য ইইউভুক্ত দেশে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজনের অনুরোধ করেন। উপদেষ্টা বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা ও ঐকমত্যের মাধ্যমেই এটি সফল হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং ধীরে ধীরে এর উন্নতি হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইইউ বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সামগ্রিক অপরাধ পরিসংখ্যান, বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। রাষ্ট্রদূত কর্তৃক মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, সঠিক তথ্য জনগণের কাছে সরবরাহ করা গেলে ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশ বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে এবং তিনি গণমাধ্যমকে সর্বদা সঠিক তথ্য পরিবেশনের অনুরোধ জানিয়ে আসছেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা রয়েছে, তবে বাস্তবে কক্সবাজারে এর চেয়েও বেশি শরণার্থী বসবাস করছে, যা ঐ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি স্বরূপ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাও রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছে।
মানবপাচার ও চোরাচালান প্রতিরোধে ইইউ বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতি বছর বহু বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখানে দালাল ও মানবপাচার চক্রের শিকার হয়ে অনেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রাণ হারায়। অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে বাংলাদেশ, লিবিয়া ও ইইউর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এবং পরবর্তীতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেন রাষ্ট্রদূত। উপদেষ্টা এ বিষয়ে ইইউকে নেতৃত্ব দেওয়ার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন এবং বাংলাদেশ এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবে বলে জানান।
আরও দেখুন
প্রবাস টাইমে লিখুন আপনিও। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা আয়োজন, ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, সাফল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খবর, ছবি ও ভিডিও আমাদের পাঠাতে পারেন news@probashtime.com মেইলে।


















